শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

কিশোর গ্যাং: চাঁদপুরে ৩৭০ আটক, সারাদেশে বাড়ছে উদ্বেগ

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • Editing Section
৫৯১ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে একদিনে ৩৭০ জনকে আটক করার ঘটনা নতুন করে ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। রোববার সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জেলার আটটি থানা ও ডিবি পুলিশ একযোগে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। পরে ৩৫৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৫ জনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশের হিসাবে, চাঁদপুর সদরে ৩৫, হাইমচরে ৪৮, ফরিদগঞ্জে ৪১, হাজীগঞ্জে ৩৭, কচুয়ায় ৬২, শাহরাস্তিতে ৪৫, মতলব উত্তরে ৫২ এবং মতলব দক্ষিণে ৩৬ জনকে আটক করা হয়। এর বাইরে ডিবি পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ১৪ জনকে আটক করে।

একটি জেলার আট উপজেলায় একযোগে এত বিপুলসংখ্যক কিশোর ও তরুণকে আটকের ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। তবে এটিকে শুধু চাঁদপুরের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিশোর গ্যাং এখন দেশের বিভিন্ন শহর, জেলা সদর, মফস্বল এমনকি প্রত্যন্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য ও সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা কয়েক শ বলে উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে সারাদেশে আনুমানিক ২৩৭ থেকে ৩৮৬টি গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়েছে। এসব গ্রুপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং ভাসমান সদস্যদের হিসাব যুক্ত করলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

রাজধানী ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়। ঢাকা মহানগরীতে প্রায় ১৫৯টি গ্যাংয়ের তথ্য বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। শুধু মোহাম্মদপুর থানা এলাকাতেই ২৭টি গ্যাংয়ের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। পল্লবী, মিরপুর, খিলগাঁও, হাতিরঝিল ও যাত্রাবাড়ী এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার খবর রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন তথ্যে সেখানে ৫৭ থেকে ৯৮টি গ্যাংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চকবাজার, জামালখান, খুলশী, আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গার মতো এলাকায় বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। জেলা পর্যায়েও চিত্রটি স্বস্তিদায়ক নয়। নোয়াখালীতে প্রায় ২৫টি, কুমিল্লায় ২০টির বেশি, সিলেটে প্রায় ১৫টি, গাজীপুর ও রাজশাহীতে প্রায় ১৩টি করে এবং খুলনায় প্রায় সাতটি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

মৌলভীবাজারেও পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন তথ্যে জেলায় প্রায় ৪ থেকে ৮টি সক্রিয় গ্রুপের কথা বলা হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর, বিশেষ করে পৌরসভা এলাকা, বর্ষিজোড়া, চাঁদনীঘাট, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়ায় ছোট ছোট গ্রুপ বা ‘ভাই কালচার’-এর অনুসারীদের তৎপরতার কথা জানা যায়। জেলাজুড়ে বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের সঙ্গে প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ কিশোর ও তরুণ নানাভাবে যুক্ত থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এসব সংখ্যাকে স্থায়ী তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এক গ্রুপ থেকে অন্য গ্রুপে যায়, আবার অনেক সময় গ্যাংয়ের নামও পরিবর্তন হয়। কোথাও একটি বড় ভাইকে কেন্দ্র করে কয়েকজন কিশোর জড়ো হয়, আবার কোথাও ছোট একটি গ্রুপ সময়ের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকাও নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজন হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে কেন?

এর পেছনে মাদক একটি বড় কারণ। মাদকের সঙ্গে কিশোর অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় আরও ছোট জায়গা থেকে। ক্লাস সিক্সের একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুলের বাউন্ডারির মধ্যেই নির্বিঘ্নে সিগারেট টানতে পারে, তাহলে তার সহপাঠীদের ওপর এর প্রভাব কী হবে—এ প্রশ্নের উত্তরও আমাদের ভাবতে হবে। একটি শিশুর হাতে সিগারেট পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে সেটি অন্য মাদকেও গড়াতে পারে। সেখানে যদি স্থানীয় অপরাধী চক্রের যোগাযোগ তৈরি হয়, তখন সেই কিশোরকে অপরাধে টেনে নেওয়া খুব কঠিন নয়।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, শহরের বিভিন্ন মহল্লার বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় বেড়ে ওঠা অনেক শিশু-কিশোর। পরিবারের আর্থিক সংকট, অভিভাবকের অনুপস্থিতি, শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়া এবং নিরাপদ বিনোদনের অভাব তাদের একটি অংশকে সহজেই অপরাধী চক্রের কাছে নিয়ে যায়। শুরুতে সামান্য টাকা, খাবার কিংবা আড্ডার মাধ্যমে তাদের কাছে টানা হয়। পরে সেই কিশোরই হয়ে ওঠে দলের নিয়মিত সদস্য। আরও পরে সে নিজেই অন্য কিশোরদের দলে ভেড়ানোর কাজে যুক্ত হয়।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে ভয়ংকর।

কারণ কিশোর গ্যাংয়ের একজন সদস্য শুধু একজন অপরাধী নয়; সে একই সঙ্গে নতুন সদস্য তৈরির একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। ফলে একজনকে ধরে ছেড়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পেছনে থাকা ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে হয়।

আর এখানেই আসে ‘বড় ভাই’ বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রসঙ্গ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেলে একটি ছোট কিশোর গ্রুপও দ্রুত বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিছু গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল।

তবে বিষয়টি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো যাবে না। যে দলেরই কোনো নেতা কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করুন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিশোরদের সামনে রেখে রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

এ কারণে শুধু কিশোরদের আটক করলেই হবে না। প্রতিটি গ্যাংয়ের পেছনে কারা রয়েছে, কে টাকা দিচ্ছে, কে অস্ত্র বা মাদক সরবরাহ করছে, কার নির্দেশে তারা মাঠে নামছে—এসবও খুঁজে বের করতে হবে। কারণ মূল হোতাকে আড়ালে রেখে শুধু কিশোরদের আটক করা হলে একই জায়গায় নতুন আরেকটি দল তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এখন প্রয়োজন সারাদেশে সমন্বিত কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান। শুধু চাঁদপুর নয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, মৌলভীবাজারসহ যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে নিয়মিত অভিযান চালানো দরকার। একই সঙ্গে পুলিশের কাছে থাকা তালিকা হালনাগাদ করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থাকলে কোন এলাকায় কতটি গ্রুপ, কারা সদস্য, তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের পেছনে কারা আছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তবে অভিযানই একমাত্র সমাধান নয়।

কিশোরদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এসব কমিটিতে শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, সমাজের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি এবং প্রয়োজনে পুলিশ কর্মকর্তাদের যুক্ত করা যেতে পারে। উদ্দেশ্য হবে কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে খুঁজে বের করা নয়; তার আগেই তাকে ঝুঁকির তালিকা থেকে বের করে আনা।

একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়েও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ যখন দলীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সহজেই স্থানীয় রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে এই রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক কোথায় তৈরি হচ্ছে, সেটি খুঁজে দেখা জরুরি। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতি কী হতে পারে, সরকারকে সে বিষয়েও সামাজিক ও নীতিগত আলোচনা শুরু করতে হবে।

কারণ কিশোর গ্যাংয়ের শিকড় শুধু রাস্তায় নয়; এর একটি অংশ ঢুকে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেও।

সবচেয়ে বড় কথা, কিশোরদের সবাই অপরাধী নয়। অনেক কিশোর পরিস্থিতির শিকার। কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউ দারিদ্র্যের কারণে স্কুল ছেড়েছে, কেউ মাদকের ফাঁদে পড়েছে, আবার কেউ বড় ভাইয়ের প্রভাবে অপরাধে জড়িয়েছে। তাই দমনমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সংশোধন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগও রাখতে হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে যারা এসব কিশোরকে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। একজন কিশোরকে সামনে রেখে যে ব্যক্তি মাদক বিক্রি করছে, অস্ত্র দিচ্ছে, চাঁদাবাজি করাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে রক্ষা করছে, তার দায় কোনোভাবেই ওই কিশোরের চেয়ে কম হতে পারে না।

চাঁদপুরের ৩৭০ জনকে আটকের ঘটনা তাই শুধু একটি জেলার অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সতর্ক সংকেত। এখনই যদি কিশোর গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আজ যে কিশোর সিগারেট দিয়ে শুরু করছে, কাল সে মাদকে যেতে পারে; আজ যে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, কাল সে একটি অপরাধী দলের সদস্য হতে পারে। আর সেই দল যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়া পায়, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হবে।

তাই এখনই সময় সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার। কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান হতে হবে নিয়মিত, তথ্যভিত্তিক ও সারাদেশব্যাপী। একই সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করা, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে শুধু শাস্তি দিলে সমস্যার একটি অংশের সমাধান হবে। কিন্তু যারা তাদের ব্যবহার করে, তাদের চিহ্নিত না করলে সমস্যাটি থেকেই যাবে। আজকের কিশোরকে যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে আগামী দিনের একটি প্রজন্মকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর সেই কাজটি শুরু করার সময় এখনই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন