সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায় চীন
ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায় চীন। কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে আছে, নাকি বিরোধী দলে—তার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব নির্ধারণ করে না বেইজিং। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী দেশটি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় এসব কথা বলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং। তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় আসেন তিনি।
ঢাকায় চীন দূতাবাস আয়োজিত ‘যেখানে ইতিহাস পথ দেখায়: চীন-বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের গণ্ডি ছাড়িয়ে উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন লিউ হাইসিং। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের উদ্বোধন করা হয়।
লিউ হাইসিং বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা আদর্শিক বিভাজন তৈরি করি না। কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে আছে, নাকি সরকারের বাইরে, তার ভিত্তিতে আমাদের বন্ধুত্ব নির্ধারণ করি না।’
অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও অংশীদারত্বের সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিএনপি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন রিজভী। চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও বস্ত্র খাতে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে বলে জানান রিজভী। চীনা বিনিয়োগকারীদের এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যঘাটতি কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা।
রিজভী আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় তা আরও গতিশীল হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে লিউ হাইসিং বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। চীন তার ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় অত্যন্ত সময়োপযোগী।
নতুন উদ্বোধন করা বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ দুই দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন লিউ হাইসিং। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তরুণ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতেও কেন্দ্রটি কাজ করবে বলে জানান তিনি।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করে লিউ হাইসিং বলেন, সিপিসির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের ফলাফল এবং বিশেষ করে সি চিন পিংয়ের পার্টি গঠনবিষয়ক চিন্তাধারা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত চীন।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে লিউ হাইসিং বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল দেড় কোটি ডলার। বর্তমানে তা ২৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে সড়ক, সেতু ও টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি মোংলা বন্দর শিল্পাঞ্চল এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সূত্র: প্রথম আলো