আন্দোলনের পরিচয়ে চাঁদাবাজি: পরিবর্তনের স্বপ্ন কি অপরাধীদের হাতে জিম্মি?
এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে মানুষের প্রত্যাশা থাকে নতুন সমাজ, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার। মানুষ চায়, আগের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান ঘটুক। কিন্তু পরিবর্তনের পর যদি নতুন পরিচয়ে পুরোনো অপরাধের চর্চা শুরু হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়। রাজনৈতিক পরিচয়, আন্দোলনের স্লোগান কিংবা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি ব্যবহার করে কেউ যদি মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে, ভয় দেখায় বা আইনের নামে হয়রানি করে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; পুরো পরিবর্তনের চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এমনই উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের পরিবারের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও কর্মী পরিচয় দিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। পরে সেই পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে একটি পরিবারের সদস্যকে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশের হাতে আটক হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মামলার দুই আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের একজন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ বলেছেন, ‘আমি গরিবের ছেলে, টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’ এই বক্তব্যের মধ্যে ব্যক্তিগত লোভের স্বীকারোক্তি থাকলেও ঘটনাটির গভীরতা শুধু অর্থের লোভে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আন্দোলনের পরিচয়, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণেই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল অন্যায়, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে।
কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সেই আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করে, তাহলে তা আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আন্দোলনের পরিচয় কারও জন্য বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সনদ নয়। এটি কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও দেয় না।
সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাবশালী পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করেন। কেউ নিজেকে সমন্বয়ক, কেউ আন্দোলনের নেতা, কেউ আবার ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। এসব পরিচয় ব্যবহার করে থানায় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ, জমি দখল কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
গুলশানের ঘটনাটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অভিযোগ অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে একটি বাসায় অভিযান চালান। সাবেক সংসদ সদস্যকে সেখানে না পেয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পর তাঁদের কয়েকজন আবার ওই বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। রাজনৈতিক পরিচয় ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে তাঁরা চাঁদা দাবি করেন বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা সংগঠনের সদস্য কীভাবে পুলিশের অভিযানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে কতটা নির্ভর করবে? পুলিশের অভিযান পরিচালনা, কাউকে গ্রেপ্তার কিংবা কোনো বাসায় তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি আন্দোলনের সমন্বয়ক বা রাজনৈতিক কর্মী পরিচয় দিলেই তিনি আইন প্রয়োগের অংশ হয়ে যেতে পারেন না।
অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্যের অনৈতিক যোগসাজশ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে প্রমাণ ছাড়া পুলিশকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। বরং তদন্তের মাধ্যমে দেখতে হবে, কারা কীভাবে অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং কোনো পর্যায়ে দায়িত্বের অপব্যবহার হয়েছিল কি না।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠতে পারে। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থক, নেতা কিংবা সাবেক জনপ্রতিনিধির পরিবারের সদস্য—এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করার কোনো বৈধতা নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলে পুলিশ তদন্ত করবে, আদালত বিচার করবেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজে থেকে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে শাস্তি দিতে বা অর্থ আদায় করতে পারে না।
আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো—আইনের চোখে সবাই সমান। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে আইনের বাইরে গিয়ে হয়রানি করার অধিকারও কারও নেই।
গুলশানের ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। তবে এই ঘটনায় আন্দোলনের পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও নেতৃত্বেরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের উচিত, কেউ আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা এবং এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।
একই সঙ্গে ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো আন্দোলন বা আন্দোলনে অংশ নেওয়া লাখো মানুষের ওপর চাপানোও অন্যায়। একটি আন্দোলনের অর্জন ও নৈতিক ভিত্তি বিচার করতে হয় তার লক্ষ্য, অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা এবং সামগ্রিক অবদানের ভিত্তিতে। কয়েকজনের অপরাধের কারণে সেই আন্দোলনের সব অর্জন মুছে যায় না। তবে অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করা বা তাদের প্রতি রাজনৈতিক সহানুভূতি দেখানোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রথম প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করতে হবে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দলের, যে সংগঠনের বা যে আন্দোলনের পরিচয়ই ব্যবহার করুন না কেন, তাঁর ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগে কোনো ছাড় থাকা উচিত নয়।
পুলিশের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো অভিযানে বেসরকারি ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ, তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা এবং গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া—সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে রাখতে হবে। কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত নিজেদের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। সংগঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তা ধামাচাপা না দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। কারণ নীরবতা অনেক সময় অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।
পরিবর্তনের পর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রে আর কেউ ক্ষমতা বা পরিচয়ের জোরে অন্যের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু নতুন পরিচয়ে যদি পুরোনো ধরনের ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য শুধু ক্ষমতার পালাবদলে নয়, বরং নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
গুলশানের ঘটনাটি তাই শুধু একটি চাঁদাবাজির মামলা নয়; এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। আন্দোলনের পরিচয় কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আর জনগণের দেওয়া নৈতিক সমর্থনও অপরাধের লাইসেন্স হতে পারে না। যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ রাজপথে নেমেছিল, সেই পরিবর্তনের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে অপরাধী যে পরিচয়ই ব্যবহার করুক, তাকে আইনের মুখোমুখি করতেই হবে।