দৃষ্টিশক্তি নেই, তবু এইচএসসিতে জিপিএ-৫; জুড়ীর মৌমিকে নিয়ে গর্ব
তাম্বির আহমদ, জুড়ী (মৌলভীবাজার): চোখে পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও কঠোর অধ্যবসায়ের কাছে হার মেনেছে সব প্রতিকূলতা। জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে এবারের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর গ্রামের তাহমিনা আক্তার মৌমি। তাঁর এই সাফল্যে গর্বিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
মৌমি সিলেট সরকারি মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি জায়ফরনগর গ্রামের আব্দুল আহাদ ও আমিনা আক্তার পুষ্প দম্পতির মেয়ে। বর্তমানে সিলেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করা প্রতিষ্ঠান গ্রিন ডিসএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশনের (জিডিএফ) আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মৌমির এই সাফল্যে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন জুড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সদর জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মাছুম রেজা।
তিনি বলেন, “জুড়ীর মাটিতে মৌমির মতো একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়। তাঁর এই সাফল্যে আমরা আনন্দে আপ্লুত। মৌমি প্রমাণ করেছে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই মেধা ও যোগ্যতার পথে বাধা হতে পারে না। তিনি সমাজের বোঝা নন; বরং নিজের যোগ্যতা ও সাফল্যের মাধ্যমে সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমরাও পারি। তাঁর এই অর্জন শুধু জুড়ী নয়, পুরো দেশের জন্য অনুপ্রেরণা। আমি তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি এবং সবাইকে এমন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
জিডিএফের নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ আহমদ খান জানান, মৌমি প্রথম শ্রেণি থেকেই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের আবাসিক শিক্ষার্থী। তাঁর এই ব্যতিক্রমী সাফল্যে প্রতিষ্ঠানের সবাই আনন্দিত ও গর্বিত।
নিজের অনুভূতি জানিয়ে মৌমি বলেন, চোখে পৃথিবীর আলো দেখতে না পেলেও স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার রয়েছে। এই অর্জন শুধু তাঁর একার নয়; বাবা-মা, শিক্ষক ও জিডিএফের সহযোগিতার ফল। ভবিষ্যতে আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের মানুষের সেবা করতে চান তিনি।
মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আব্দুল আহাদ বলেন, জন্ম থেকেই তাঁর মেয়ে চোখে দেখতে পায় না। তবে পড়াশোনার প্রতি মেয়ের আগ্রহ দেখে তাঁরা কখনো তাকে পিছিয়ে পড়তে দেননি। মেয়ের এই অর্জনে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত। তিনি সবার কাছে মেয়ের জন্য দোয়া কামনা করেন।
উল্লেখ্য, দৃষ্টিশক্তি না থাকায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের সহায়তা নিতে হয়েছে মৌমিকে। তাঁর শ্রুতিলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পল্লব রায়। তিনি হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী। পরীক্ষার হলে মৌমির বলে দেওয়া উত্তর খাতায় লিখে এই সাফল্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পল্লব।
মৌমির এই অর্জন শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও হার না মানা মানসিকতার দৃষ্টান্ত। তাঁর সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
জুড়ীর এই মেধাবী তরুণীর সাফল্যে আনন্দিত এলাকাবাসী। তাঁর আগামী দিনের পথচলা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক—এমন প্রত্যাশা সবার।