শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৫৭৮ বার দেখা
শেয়ার করুন

পারভেজ হাসান | বিশেষ প্রতিবেদন

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রাম। এই গ্রামের মাটিতেই জন্মেছিলেন বাংলা মরমি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সংগীতের অন্যতম সাধক শেখ ভানু শাহ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও যিনি জীবন, প্রেম, বিরহ, আত্মজিজ্ঞাসা ও স্রষ্টার সন্ধান নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য মরমি গান ও সাহিত্যকর্ম। তাঁর গান ও সাধনজীবন ঘিরে প্রচলিত নানা কাহিনি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্মের আবেদন রয়ে গেছে লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামসহ বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

শেখ ভানু শাহের জন্মসাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে ১৮৪৯ ও ১৮৫৯ সাল—দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর পিতার নাম মুন্সি নাসিরুদ্দিন। প্রচলিত জীবনকথা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। জীবনের প্রথম দিকে ধানের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসার সুবাদে ‘ভানু ব্যাপারী’ নামেও পরিচিতি লাভ করেন। একসময় আর্থিক সচ্ছলতা এলেও জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর চিন্তাজগতে আসে পরিবর্তন। পার্থিব সম্পদের মোহ পেরিয়ে তিনি মনোনিবেশ করেন আত্মজিজ্ঞাসা ও আধ্যাত্মিক সাধনায়।

যে ঘটনা বদলে দিয়েছিল জীবনদর্শন

শেখ ভানু শাহের আধ্যাত্মিক জীবনে পরিবর্তনের সূচনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি ঘটনা প্রচলিত রয়েছে। জীবনকথার বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন ধানের ব্যবসার কাজে নৌকায় যাত্রা করার সময় মেঘনা নদীর তীরবর্তী মাদনা নৌবন্দরের কাছে নদীর বাঁকে একটি মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখেন তিনি। মৃতদেহটির চোখ কাক ঠুকরে খাচ্ছিল। জীবনের এমন করুণ পরিণতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

যে জীবন নিয়ে মানুষের এত অহংকার, সম্পদ ও সংসারের প্রতি এত মোহ, মৃত্যুর পর সেই জীবনের পরিণতি কী—এমন প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তোলে বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

লোকমুখে প্রচলিত আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়, মৃতদেহটি দেখার পর তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন। সঙ্গে থাকা লোকজন তাঁকে খুঁজতে নদীতে জাল ফেলেও সন্ধান পাননি। পরে তাঁরা বাড়িতে ফিরে তাঁকে সেখানে দেখতে পান বলে কাহিনিটি প্রচলিত। ঘটনাটিকে কেউ কেউ অলৌকিক বলে বর্ণনা করেন। তবে এ ঘটনার স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত নয়। তাই এটিকে শেখ ভানু শাহের জীবন ঘিরে প্রচলিত লোককথা হিসেবেই দেখা সমীচীন।

এই ঘটনার পর তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আসে বলে স্থানীয় জীবনকথায় বলা হয়। পার্থিব সম্পদের অনিত্যতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং মানুষের আত্মিক পরিচয় অনুসন্ধান তাঁকে সাধনার পথে এগিয়ে নেয়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি সুফি সাধক মীরান শাহ তাঁতারীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেখ ভানু শাহের সাধনজীবন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে সাহিত্যসাধনা

শেখ ভানু শাহের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই তাঁর সৃজনশীলতার বিকাশ। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় এক হাজার মরমি গান, পুঁথি, বারোমাসি ও কবিতা রচনা করেন। তবে তাঁর রচনার সঠিক সংখ্যা এবং সম্পূর্ণ তালিকা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তাঁর রচনায় প্রেম, বিরহ, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, নৈতিকতা ও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। সুফি ভাবধারার সঙ্গে মানবিক অনুভূতির মেলবন্ধন তাঁর গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সহজ ভাষা, পরিচিত উপমা ও লোকজ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন জীবনের গভীরতর অর্থ।

তাঁর গানে বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের শুদ্ধতা, আত্মসংযম এবং সত্যের সন্ধান গুরুত্ব পেয়েছে। মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, মনের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মিক মুক্তির প্রশ্ন তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। এ কারণেই তাঁর গান কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; অনেকের কাছে তা জীবন ও আত্মোপলব্ধির অনুষঙ্গ।

শেখ ভানু শাহের নামে ‘আশরারুল এশক’, ‘চেহেল অজুদ’ ও ‘পুঁথি শেখ ভানু’সহ কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এসব গ্রন্থের নাম, বানান, পাণ্ডুলিপি ও প্রকাশনার ইতিহাস নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর রচনাসম্ভার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণার আওতায় আনা গেলে বাংলা মরমি সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।

‘নিশীতে যাইও ফুলবনে’ গানে অমলিন পরিচিতি

শেখ ভানু শাহের নামে প্রচলিত ‘নিশীতে যাইও ফুলবনে রে, ভ্রমরা নিশীতে যাইও ফুলবনে’ গানটি বাংলা লোকসংগীতের জগতে বিশেষ পরিচিত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের কণ্ঠে গানটির পরিবেশনা এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে।

গানটির পরিচিত চরণে ফুলবন ও ভ্রমরের চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে যে আবেগময় আবহ তৈরি হয়, তা শ্রোতাকে প্রেম, আকুলতা ও বিরহের অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। লোকসংগীতের এমন উপমা অনেক সময় আক্ষরিক অর্থ ছাড়িয়ে গভীর মানবিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে।

তবে গানটির রচয়িতা, মূল কথার পাঠ এবং বিভিন্ন পরিবেশনায় ব্যবহৃত কথার উৎস নিয়ে ভিন্ন দাবি থাকায় এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সংগীত-ইতিহাস ও প্রামাণ্য সূত্র যাচাই করা জরুরি। লোকমুখে প্রচলিত কোনো গানকে নির্দিষ্ট সাধকের রচনা হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রামাণ্য দলিল, পাণ্ডুলিপি কিংবা গ্রহণযোগ্য গবেষণার সহায়তা প্রয়োজন।

ভাদিকারা গ্রামে স্মৃতি ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

শেখ ভানু শাহের জীবন ও সৃষ্টিকর্মের স্মৃতি তাঁর জন্মস্থান ভাদিকারা গ্রামের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রামীণ লোকঐতিহ্য, মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত গান এবং তাঁর জীবন ঘিরে নানা কাহিনি স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। ভিক্ষুকের বদদোয়া কতটা ভয়ংকর? | নাসির উদ্দিন যুক্তিবাদী, গোপালগঞ্জ | E Bangla 71

বাংলার মরমি সংগীতের ধারায় এমন সাধকদের অবদান শুধু তাঁদের রচিত গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের সৃষ্টি মানুষের জীবনবোধ, নৈতিক চিন্তা, প্রেম, বিরহ এবং আত্মিক অনুসন্ধানের নানা দিককে ধারণ করে। শেখ ভানু শাহের জীবন ও সাহিত্যকর্মও সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তাঁর জন্মসাল, রচনার প্রকৃত সংখ্যা, গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি এবং গানের নির্ভরযোগ্য পাঠ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত পুরোনো পুঁথি, গানের খাতা, মৌখিক ইতিহাস ও প্রবীণদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা জরুরি। এসব উদ্যোগ তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রামাণ্য পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।

সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেলেও মানুষের মনে টিকে থাকে কিছু গান, কিছু জীবনদর্শন এবং কিছু সাধকের স্মৃতি। লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামের শেখ ভানু শাহ তেমনই এক নাম—যাঁর জীবন ও গানকে ঘিরে মরমি ঐতিহ্যের অনুসন্ধান আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণার মধ্য দিয়েই এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন