আরাফাতের ময়দানে লাখো মুসল্লি: হজের মূল মহিমা ও বিদায়ী খুতবার শিক্ষা
— এস এম মেহেদী হাসান
আজ ২৬ মে, ১৪৪৭ হিজরির ৯ জিলহজ। বিশ্ব মুসলিমের জন্য পরম আকাঙ্ক্ষার এক মহিমান্বিত দিন। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কার আকাশ-বাতাস আজ মুখরিত লাখো মানুষের সমবেত কণ্ঠে—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক…”
(আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির।)
পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম ফরজ রোকন হলো ‘ওকুফে আরাফাহ’ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান। আজ বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশ থেকে আগত লাখো মুসল্লি সাদা সেলাইবিহীন দুই টুকরো ইহরামের কাপড় পরে মিনা থেকে এসে সমবেত হয়েছেন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, বর্ণ-ভাষা ও জাতিগত সব বিভেদ ভুলে সবাই আজ একই কাতারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনায় মগ্ন।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, হজের সূচনা মানবজাতির প্রথম নবী হযরত আদম (আ.)-এর সময় থেকে হলেও এর আধুনিক ভিত্তি স্থাপন করেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। আল্লাহর নির্দেশে তিনি ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) পবিত্র কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ করেন এবং মানবজাতিকে হজের আহ্বান জানান।
পরবর্তীতে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই ইবাদতকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য এর বিধান সুস্পষ্ট করে দেন।
হিজরি ১০ম বর্ষের ৯ জিলহজ, আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায়ী হজের খুতবা প্রদান করেন। প্রায় সোয়া লাখ সাহাবির সামনে দেওয়া সেই ভাষণ মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবাধিকার ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচিত।
রাসূল (সা.) বলেছিলেন:
“কোনো আরবের ওপর অনারবের, আর অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদারও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।”
তিনি নারীদের প্রতি সদাচরণ ও তাদের অধিকার রক্ষার কঠোর নির্দেশ দেন।
জাহেলি যুগের সব সুদ ও প্রতিশোধ প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে একে অপরের জন্য পবিত্র আমানত হিসেবে ঘোষণা করেন।
খুতবার শেষে মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন—
“আমি কি আল্লাহর বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি?”
সমবেত সাহাবিরা উত্তর দিয়েছিলেন—
“হ্যাঁ, পৌঁছে দিয়েছেন।”
এরপর নাজিল হয় পবিত্র কোরআনের সেই ঐতিহাসিক আয়াত:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম…”
(সূরা মায়েদা: ৩)
চলতি ২০২৬ সালের (১৪৪৭ হিজরি) হজে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও নানা আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও আল্লাহর মেহমানদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবার বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৫ লাখ (১.৫ মিলিয়ন) মুসল্লি হজে অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ হজ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স ও ফ্লাইনাসের মোট ২০১টি প্রাক-হজ ফ্লাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এবার ৭৭ হাজার ৪৩২ জন হাজি সৌদি আরব পৌঁছেছেন।
এর মধ্যে:
(প্রতিনিধি ও গাইডসহ)
আজ ২৬ মে আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের মূল খুতবা প্রদান করেন এবং জোহর ও আসরের নামাজে ইমামতি করেন শায়খ আল্লামা ড. আলী বিন আব্দুল রহমান আল-হুজাইফী।
তিনি মদিনার পবিত্র মসজিদে নববীর প্রধান ইমাম ও খতিব হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর দেওয়া খুতবা বাংলাসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি ভাষায় সরাসরি অনুবাদ ও সম্প্রচার করা হয়েছে।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো হজ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি হজ পালনকালে কোনো অশ্লীলতা বা গুনাহে লিপ্ত না হয়, সে সদ্যোজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।
হজ পৃথিবীর বৃহত্তম বার্ষিক ধর্মীয় সম্মেলন। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষ একই পোশাকে একত্রিত হয়ে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ইহরামের সাদা পোশাক, আরাফাতের প্রান্তরে অবস্থান এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাভেজা প্রার্থনা মানুষকে হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান শেষে সূর্যাস্তের পর হাজিরা রওনা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপনের পর আগামীকাল ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।